-রুনা রহমান
সম্পর্ক কিংবা সামাজিক জীবনে কিছু মানুষের সঙ্গে পথ চলতে গিয়ে হঠাৎ করেই কিছু অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। আপনি যখন কোনো বাস্তবসম্মত কথা বলবেন, কোনো অসঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন কিংবা কারও আচরণের ব্যাখ্যা চাইবেন—তখন অপর পক্ষ নিজের ভুল, সীমাবদ্ধতা বা অক্ষমতা স্বীকার করার পরিবর্তে উল্টো আপনাকেই অপরাধী প্রমাণ করার এক মরিয়া খেলায় মেতে উঠতে পারে।
সাইকোলজির ভাষায় এ ধরনের আচরণের সঙ্গে Projection, Blame-shifting এবং Toxic Guilt-tripping-এর মতো মনস্তাত্ত্বিক ধারণাগুলোর সম্পর্ক রয়েছে। আর যখন কাউকে তার নিজের উপলব্ধি, স্মৃতি কিংবা বাস্তবতা নিয়েই সন্দেহের মধ্যে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তখন সেটি Gaslighting-এর পর্যায়ে যেতে পারে।
এই ধরনের আচরণের পেছনে প্রায়ই একটি Chained Mechanism কাজ করে, যা ধাপে ধাপে এগোয়—
১. ডিফেন্স মেকানিজম অ্যাক্টিভেশন (Defense Mechanism):
নিজের কোনো কথা রাখতে না পারা, ভুল করা, দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া কিংবা নিজের সংকীর্ণতা যখন সামনে চলে আসে, তখন তাদের ভেতরের ইগো চরমভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হতে পারে। নিজের ভুল স্বীকার করার পরিবর্তে আত্মরক্ষার প্রবণতা সক্রিয় হয়। সেই অবচেতন লজ্জা, অস্বস্তি বা অপরাধবোধ থেকে বাঁচতে তারা নিজেদের ভেতরের নেতিবাচক অনুভূতিগুলো অপর পক্ষের ওপর Project করে দিতে পারে।
২. রিয়েলিটি ডিস্টরশন (Reality Distortion):
এরপর শুরু হয় ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া। খুব স্বাভাবিক একটি পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়। এমন কিছু শব্দ, অভিযোগ বা ব্যাখ্যা ব্যবহার করা হয়, যাতে অপর পক্ষ ধীরে ধীরে Cognitive Dissonance-এর মধ্যে পড়ে যায়। অর্থাৎ নিজের দেখা, বোঝা, অবস্থান এবং অনুভব করা বাস্তবতাটাই নিয়ে সে সন্দেহ করতে শুরু করে।
৩. স্টোনওয়ালিং বা সাইলেন্ট ট্রিটমেন্ট (Stonewalling / Silent Treatment):
এরপর তাঁরা যোগাযোগ থেকে সরে যাওয়া, দূরত্ব তৈরি করা কিংবা নীরবতাকে এক ধরনের Power Game হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। উদ্দেশ্য কখনো কখনো খুব পরিষ্কার—অপর পক্ষকে মানসিক শান্তিতে না রাখা, তাকে তীব্র অস্থিরতার মধ্যে ফেলা এবং সম্পর্কের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখা।
এই পর্যায়ে যে মানুষটি প্রশ্ন তুলেছিল, সে-ই একসময় নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আর যে মানুষটির আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, সে ধীরে ধীরে নিজেকে ভিকটিম হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করে।
আসলে, নিজের অন্যায় আচরণকে আড়াল করতে যারা বারবার Victim Card খেলে, দোষ অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয় কিংবা প্রতিটি পরিস্থিতিতে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার অজুহাত খোঁজে—তারা আর যা-ই হোক, সেই মুহূর্তে অন্তত মানসিকভাবে সুস্থ ও ম্যাচিউর কমিউনিকেশনের পরিচয় দিচ্ছে না।
সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, এই ধরনের আচরণ দীর্ঘদিন চলতে থাকলে অপর পক্ষ ধীরে ধীরে নিজের আত্মবিশ্বাস হারাতে পারে। নিজের অনুভূতি, বিচারবোধ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হতে পারে। তখন অন্যের চাপিয়ে দেওয়া কৃত্রিম অপরাধবোধ (Guilt)-ই তার নিজের সত্য বলে মনে হতে শুরু করে।
কিন্তু সেই কৃত্রিম অপরাধবোধ নিজের মাথায় নিয়ে নিজেকে ছোট করে না ফেলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একজন মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত অন্যের তৈরি করা অপরাধবোধের খেলায় অংশগ্রহণ করতে অস্বীকার করে, ততক্ষণ পর্যন্ত সেই Manipulation তার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।
খেলাটা ঠিক সেখানেই শেষ হয়ে যায়।
মাস্টার ম্যানিপুলেটরদের সস্তা ইগো গেমের চেয়ে নিজের আত্মসম্মান, মানসিক স্বাধীনতা এবং মানসিক শান্তি অনেক বেশি মূল্যবান।
প্রকাশকঃ শাহিদুর রহমান
মোবাইল 01581-281810
e-mail
newswatch71@gma.com