
রাজধানীর নিকুঞ্জ এলাকায় প্রতিদিন কোটি টাকার নগদ লেনদেনের হাট বসছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ হাটের আয়োজক ‘জেনারেল গ্রুপ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির সাজানো অফিসে প্রকাশ্য প্রতারণার রমরমা বাণিজ্য চলছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। প্রতারণার টাকার জৌলুশ দেখিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। প্রলোভনের ফাঁদে পড়ছেন সহজ-সরল মানুষ। অথচ এ বিষয়ে দেশের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
একটি গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী দলের ক্যামেরায় ধারণ করা দৃশ্যে দেখা যায়, কথিত জেনারেল গ্রুপের সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং পরিচালক খোকন মিয়া লাখ টাকার একাধিক বান্ডিল ক্যামেরার সামনে প্রদর্শন করছেন। তাঁর দাবি, তাঁদের ‘ম্যাজিক ব্যবসার’ নীতি রাতারাতি যে কারও ভাগ্য বদলে দিতে পারে। এক টাকা বিনিয়োগ করলে তা এক বছরের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে বিনিয়োগকারীর হাতে ফিরবে। এর পাশাপাশি সম্পদও দেওয়া হবে বলে দাবি করা হচ্ছে। টাকা ও সম্পদ বাড়ানোর এমন লোভনীয় প্রস্তাবে এক শ্রেণির মানুষ আকৃষ্ট হচ্ছেন।
এই প্রলোভনে মানুষকে টানতে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা দেশব্যাপী এজেন্ট নিয়োগ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সহজ-সরল মানুষকে নিয়ে এলে এজেন্টদের মোটা অঙ্কের তাৎক্ষণিক কমিশন দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ‘হানি ট্র্যাপ’-এর প্রস্তাবও রয়েছে বলে অভিযোগ। উঠতি বয়সী কিছু তরুণীকে বিশেষ কমিশনের বিনিময়ে কাজে লাগানো হচ্ছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবহৃত ওয়েব ঠিকানা খুঁজতে গিয়ে অভিযোগের বিষয়টি সামনে আসে। কর্মকর্তাদের ভিজিটিং কার্ডে গ্রুপটির অধীনে জেনারেল মেঘা হোল্ডিংস, জেনারেল রিসোর্ট অ্যান্ড হোটেল, জেনারেল এক্সপোর্ট অ্যান্ড ইমপোর্ট, জেনারেল এগ্রো অ্যান্ড ফিশারিজ, জেনারেল অ্যাসেট ডেভেলপমেন্ট, জেনারেল মেডিকেয়ার অ্যান্ড ফার্মেসি এবং জেনারেল ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের নাম উল্লেখ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম জানতে কার্ডে দেওয়া ওয়েব ঠিকানায় খোঁজ করলে কেবল একটি পৃষ্ঠা দেখা যায়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। বরং তাঁরা গণমাধ্যমকর্মীদের বোঝানোর চেষ্টা করেন যে তাঁরা সাধারণ কেউ নন এবং তাঁদের বিষয়ে কথা বলার আগে গণমাধ্যমকে বহুবার ভাবতে হবে।
এদিকে খোঁজ নিয়ে এবং প্রতিষ্ঠানটিতে বিনিয়োগ করে সমস্যায় পড়া কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিষ্টি কথায় ও অতিরিক্ত মুনাফার স্বপ্ন দেখিয়ে কয়েকজন ব্যক্তি এ গ্রুপের নামে প্রতারণা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের দাবি, তাঁরা যেকোনো সময় পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিও রেখেছেন। ১২ মাসে টাকা দ্বিগুণ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিই তাঁদের বড় টোপ বলে অভিযোগ।
নিকুঞ্জের ৬ নম্বর সড়কের ৩ নম্বর বাসায় এ গ্রুপের কার্যালয়ে নগদ টাকার লেনদেন চলে বলে অভিযোগ রয়েছে। একজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে অন্যজনকে দেওয়া হচ্ছে। একজনকে মুনাফা দিয়ে অনেকের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহের কৌশল হিসেবে কর্মকর্তাদের টেবিলে লাখ টাকার একাধিক বান্ডিল সাজিয়ে রাখা হয় বলে দাবি করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী বলেন, “খোকন মিয়া সাহেব খুব মিষ্টি ভাষায় কথা বলেন। ব্যবসার বড় বড় স্বপ্ন দেখান। এভাবেই চলছে তাঁদের প্রতারণা।”
প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট না থাকার বিষয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইব্রাহিম খলিল সৌরভের মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কোম্পানির ওয়েবসাইট করা হয়নি। ডেভেলপমেন্টের কাজ চলছে। তাই দেখা যাচ্ছে না।”
একটি গ্রুপ অব কোম্পানির নামে প্রকাশ্যে নগদ টাকার লেনদেন এবং ১২ মাসে টাকা দ্বিগুণ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি অস্বাভাবিক কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এটা ডেভেলপমেন্টের কাজ চলছে।” ভিজিটিং কার্ডে উল্লেখ করা কোম্পানিগুলোর অস্তিত্ব আছে কি না, জানতে চাইলে ইব্রাহিম খলিল সৌরভ বলেন, “এগুলোর অনেকটাই প্রস্তাবিত কোম্পানি। দু-একটির নিবন্ধন নেওয়া আছে।” নিবন্ধিত কোম্পানিগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি রাতের খাবার খাচ্ছেন বলে ফোন কেটে দেন। একই সঙ্গে তিনি তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ভিজিটিং কার্ড পাঠাতে বলেন।
অর্থ খাতে এমন প্রতারণার অভিযোগ নিয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের নীরবতার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দৈনিক বলেন, “এ ধরনের তথ্য অনেক দেরিতে আমাদের কাছে আসে। কারণ, এগুলো ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে ঘটে থাকে। তবে তথ্য জানার পর আমরা দ্রুততম সময়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকি।” তিনি সঠিক তথ্য যথাযথ চ্যানেলে জানাতে পত্রিকাটিকে অনুরোধ জানান।