নির্বাচনের রোডম্যাপ নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিজয় দিবসের সকালে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে এসে প্রথমবারের মতো নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়ে কথা বললেন ড. ইউনূস। এর আগে সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা আগামী বছরে নির্বাচন হতে পারে আভাস দিলেও তা ছিল তাদের ব্যক্তিগত মত।

জাতির উদ্দেশে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘আমি সকল প্রধান সংস্কারগুলো সম্পন্ন করে নির্বাচন আয়োজন করার ব্যাপারে বারবার আপনাদের কাছে আবেদন জানিয়ে এসেছি।

ড. ইউনূস বলেন, ‘আমাদের সংস্কারের যে আকাংখা সেটি বাস্তবায়নে প্রতিটি কমিশনই আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের কথা আমি একটু আলাদাভাবে বলতে চাই। কেননা, এই দুটি কমিশনের সুপারিশের ওপর প্রধানত নির্ভর করছে আমাদের আগামী নির্বাচন প্রস্তুতি ও তারিখ।’ তিনি বলেন, এ প্রসঙ্গে বড় খবর হলোÑ প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়ে গেছে। কমিশন দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এখন থেকে তাদের হাতে দায়িত্ব ন্যস্ত হলো ভবিষ্যৎ সরকার গঠন করার প্রক্রিয়া শুরু করার। তারা তাদের প্রস্তুতির কাজ শুরু করেছেন। তাদের হাতে অনেক কাজ।
ভাষণের শুরুতেই তিনি স্মরণ করেন মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদ আর অগণিত শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-জনতার আত্মত্যাগের কথা; যার ফলে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে।
ড. ইউনূস বলেন, প্রথমে সবচেয়ে বড় কাজ ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা। এটা এমনিতেই কঠিন কাজ। এখন কাজটা আরও কঠিন হলো এ জন্য যে, গত তিনটা নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ করার সুযোগ ছিল না। ভোটার তালিকা যাচাই করার সুযোগ হয়নি কারোর। গত ১৫ বছরে যারা ভোটার হওয়ার যোগ্য হয়েছে, তাদের সবার নাম ভোটার তালিকায় তোলা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পর এবার বহু তরুণ-তরুণী জীবনে প্রথমবারের মতো ভোট দেবে, তাই এই অভিজ্ঞতাকে মসৃণ করার সয আয়োজন করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোট দেওয়া নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন : ড. ইউনূস বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রথম পর্যায়ে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। এরা শিগগির চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করবে বলে আমি আশা করি। আমরা এই ছয় কমিশনের চেয়ারম্যানদের নিয়ে একটি ‘জাতীয় ঐকমত্য গঠন কমিশন’ প্রতিষ্ঠা করার দিকে অগ্রসর হচ্ছি। এর কাজ হবে রাজনৈতিক দলসহ সব পক্ষের সঙ্গে মতামত বিনিময় করে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য স্থাপন হবে, সেগুলো চিহ্নিত করা এবং বাস্তবায়নের জন্য সুপারিশ করা।’
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘যেহেতু জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অতিগুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তা বিবেচনা করে আমি এই কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করব। আমার সঙ্গে এই কমিশনের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ।’ প্রথম এই ছয়টি কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর আগামী মাসেই জাতীয় ঐকমত্য গঠন কমিশন কাজ শুরু করতে পারবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
গুম কমিশন প্রসঙ্গে : প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সরকারের গঠিত গুম কমিশন গত পরশু তাদের প্রতিবেদনের প্রথম খণ্ড আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করেছেন। গুমের শিকার বহু পরিবারের নিরাপত্তার স্বার্থে এটা এখন প্রকাশ করা যাচ্ছে না। এই প্রতিবেদন পড়ার আগেই সাবধান থাকতে হবে, এটি একটি লোমহর্ষক প্রতিবেদন। যারা বেঁচে আছেন, তারা আজও মুখ খুলতে সাহস করছেন না। কারণ তাদের ভয়, জালেমরা আবার যদি ক্ষমতায় আসে, তা হলে তাদের প্রতি এরা নৃশংসতম হবে।
অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে : ড. ইউনূস বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ফ্যাসিবাদী সরকারের কাছ থেকে বিপর্যস্ত এক অর্থনীতি পেয়েছে। এ অবস্থায় ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে রপ্তানি হয়েছে ৪.১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের মাসের তুলনায় ১৫.৬৩ শতাংশ বেশি। সামগ্রিকভাবে ২০২৪ সালের জুলাই-নভেম্বর রপ্তানি ১৬.১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা গত বছর একই সময়ে ছিল ১৪.৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বছরের হিসেবে এই প্রবৃদ্ধি ১২.৩৪ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এসবের মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। তিনি জানান, মূল্যস্ফীতির বিষয়টি বিবেচনা করে সরকার গার্মেন্টস শ্রমিকদের বার্ষিক মজুরি ৯ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
কমে আসবে মূল্যস্ফীতি : মূল্যস্ফীতি শিগগিরই কমে আসবে- এই আশাবাদ ব্যক্ত করে ড. ইউনূস বলেন, গত কয়েক মাসে বাজারে কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। আমরা সরবরাহ বাড়িয়ে, আমদানিতে শুল্ক ছাড় দিয়ে, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে এবং বাজার তদারকির মধ্য দিয়ে জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে আনার চেষ্টা করছি।
স্বৈরাচার ও দোসরদের বিচার এগিয়ে চলছে : হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে জড়িত পতিত স্বৈরশাসক ও তার দোসরদের বিচার কার্যক্রম এগিয়ে চলছে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করা হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য আসামিদের বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আত্মপক্ষ সমর্থনের সব সুযোগ তারা পাবে।
স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান : ড. ইউনূস বলেন, পতিত শক্তি এখনও সর্বশক্তি দিয়ে জাতিকে বিভক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের এই হীন প্রচেষ্টাকে কোনোভাবেই সফল হতে দেবেন না। ঐক্য অটুট থাকলে তারা জনগণকে লক্ষ্য অর্জন থেকে ব্যর্থ করতে পারবে না। তিনি দেশের গণমাধ্যমকর্মী ও জনগণকে বিশ্বের কাছে দেশের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার আহ্বান জানান।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারও মনগড়া ছিল : প্রতি বছর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে হার দেখানো হয়েছে, সেটাও মনগড়া বলে ভাষণে উল্লেখ করেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের বড় কাজ হলো পাচার করা টাকা দেশে ফিরিয়ে আনা। তারা তাদের সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়ে সেটি চেষ্টা করছে।