
নিষিদ্ধ আওয়ামীলীগের দোসর, কোটা বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্রদের বিরুদ্ধে অর্থ সরবরাহকারি, স্বৈরশাসক, শেখ হাসিনার লোকজনকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে তাদের যোগসাজশে ভূয়া টেন্ডার বাণিজ্যের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা লুণ্ঠনকারী ও বিআইডব্লিউটিএ’র দুর্নীতির বরপুত্র অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাইদুর রহমানকে ড্রেজিং বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী পদে বসাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে একটি মহল। তারা যে কোন মূল্যে দুর্নীতির এই বরপুত্রকে ড্রেজিং বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী পদে বসিয়ে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার আমলের মত ড্রেজিং বিভাগের শত শত কোটি টাকা লোপাট করার জন্য সচিবালয় ও মন্ত্রী পাড়ায় দৌড়ঝাপ শুরু করেছেন। আর এই মিশনের কলকাঠি নাড়ছেন প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাইদুর রহমানের দীর্ঘদিনের ওস্তাদ বা গুরু খ্যাত বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মো: রকিবুল ইসলাম তালুকদার। ইতিমধ্যেই তিনি মেম্বার প্রকৌশল পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব পেয়েছেন। এই পদে স্থায়ী নিয়োগ পেলেই ড্রেজিং বিভাগের প্রধান প্রকৌশলীর পদ ফাঁকা হয়ে যাবে। সেখানে অন্য কোন প্রকৌশলী এলে বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মো: রকিবুল ইসলামের হাত থেকে ক্ষমতার মোয়া বেরিয়ে যাবে। অন্য দিকে তাদের অতীতের সকল দুর্নীতি ফাঁস হয়ে যাবে। আর সে কারণেই তিনি তার ক্যাশিয়ার খ্যাত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাইদুর রহমানকে এই পদে বসাতে চাচ্ছেন বলে তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে।
খোঁজখবর নিয়ে জানাগেছে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর সবচেয়ে অর্থবহ ও দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য সেক্টর হিসেবে পরিচিত ড্রেজিং বা খনন বিভাগে গত দেড় দশক ধরে একটি শক্তিশালী দুর্নীতির
সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, এই সিন্ডিকেট বর্তমান সিাকারের দুর্নীতি বিরোধী কার্যক্রম ও সংস্কার উদ্যোগ ব্যর্থ করতে সুপরিকল্পিত ভাবে সক্রিয় রয়েছে। যার নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধান প্রকৌশলী মো: রকিবুল ইসলাম তালুকদার ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সাইদুর রহমান।
একাধিক সূত্র অনুযায়ী, বিআইডব্লিউটিএর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ড্রেজিং) মোহাম্মদ সাইদুর রহমান দীর্ঘ প্রায় ১২ থেকে ১৫ বছর ধরে একই গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থেকে ড্রেজিং বিভাগের প্রায় সব বড় বড় প্রকল্প নিজে নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। এ সময়ের মধ্যে সারাদেশের ৫৩টি নৌপথের ড্রেজিং প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব ছিল তার অধীনে। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রকল্পের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকার সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী শাহজাহান খান ও-খালেদ মাহমুদ চৌধুরীর সাথে তার লেনদেন সম্পর্ক ছিলো। তখন ওই দুই মন্ত্রীর এপিএসরা এসে তার অফিস কক্ষে বসে কাজ ভাগাভাগি করতো।
সরকারী বিধান লংঘন:
পকল্প পরিচালকদের প্রকল্পের বাহিরে অন্য কোন কাজ করার বিধান না থাকা সত্বেও তিনি অননুমোদিত আইসিটি বিভাগের পরিচালক, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসাবে ড্রেজিং বিভাগের সমগ্র বাংলাদেশের প্রকল্প এবং সংরক্ষণ ড্রেজিংয়ের ড্রেজিং বিভাগ দেখা শুনা করেন। এ ছাড়াও তিনি বর্তমানে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, তুলাই, ধরলা’ পূর্নভবা নদীর প্রকল্প পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। গোপালগঞ্জ মাদারীপুর টেকেরহাট খনন প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপিতে গ্রেড ৩/৪ কর্মকর্তা প্রকল্প পরিচালক হিসাবে নিয়োগের বিধান থাকলে ফ্যাসিবাদি আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী শাহাজান খানের খুব ঘনিষ্ঠজন হওয়ার সুবাধে মোহাম্মদ সাইদুর রহমান ৬ষ্ঠ গ্রেডের সর্বকনিষ্ঠ নির্বাহী প্রকৌশলী হলেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে উক্ত প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক পদ বাগিয়ে নিয়ে ড্রেজিং কাজ না করে। পুরোটাকা লুটপাট করেছেন। এই প্রকল্পে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় মাদারীপুরের একটি ব্যাংক হতে ১২ টি পেঅর্ডার সিরিয়ালি কেটে তাদের ডেজার না থাকা সত্বেও তৎকালিন মাদারীপুর নেতাদের অনিয়ম করে শত কোটি টাকার ড্রেজিং কাজ দিয়েছেন। পরবর্তীতে বিআইডব্লিউটিএর সরকারি ড্রেজার দিয়ে কাজ করিয়ে ঐ সকল প্রাইভেট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে শতকোটি টাকার বিল প্রদান করে টাকা যোসাজসে লুটপাট করেছেন। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাইদুর রহমান দূর্নিতিতে পরিপক্ক বিধায় এর পর হতে টাকা আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি বিআইডব্লিউটিএতে চাকুরীতে প্রবেশের পর হতেই একের পর এক হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প পরিচালক পদে নিযুক্ত হয়েছেন।
১৩৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ:
ড্রেজিং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক সুত্রে জানাগেছে, প্রায় ১৩৪ কোটি টাকা আত্মসাতের মূল পরিকল্পনাকারী (মাস্টারমাইন্ড) হিসেবেও প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাইদুর রহমানের নাম বার বার উঠে এসেছে। প্রকল্প অনুমোদন, ঠিকাদার নির্বাচন, বিল পরিশোধ ও কাজের মান যাচাই-বাছাইসহ সব ক্ষেত্রেই তার একক আধিপত্য ও প্রভাব ছিল
1
সরকারি চাকুরি বিধি অনুযায়ী একই কর্মস্থলে সাধারণত তিন বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করার কোন বিধান নেই। তবে সাইদুর রহমান দীর্ঘ সময় একই দপ্তরে বহাল থাকায় প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্য মতে, এই দীর্ঘ অবস্থানই একটি সংঘবদ্ধ স্বার্থান্বেষী চক্র গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ:
একাধিক সুত্রে আরো জারাগেছে, সাইদুর রহমান অতীতে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের নিজস্ব লোক হিসেবে অভিযুক্ত। তিনি আওয়ামী সরকারের ঘনিষ্ঠ ও বলিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। তিনি কিআইডব্লিউটিএর বঙ্গবন্ধু পরিষদের
সহ-সভাপতি পদে অধিষ্টিত ছিলেন। তখন রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে তিনি বছরের পর বছর গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ও পদ আঁকড়ে ধরে রাখেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তির দাবি, প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একাধিক অভিযোগ ও মামলা অনুসন্ধানাধীন রয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে দুদকের কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা তার শুভানুধ্যায়ী হওয়ায় মোহাম্মদ সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এ কারণেই তার দুর্নীতির প্রভাব দিন দিন আরও বিস্তৃত হচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও যদি একই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কোটি কোটি টাকার প্রকল্পে বহাল থাকেন, তাহলে পরিবর্তনের জন্য এত আন্দোলন ও ত্যাগের প্রয়োজন কী ছিল?
মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা:
এ বিষয়ে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে অবিলম্বে ড্রেজিং বিভাগে নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রশাসনিক রদবদল এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য:
এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ড্রেজিং) মোহাম্মদ সাইদুর রহমানের বক্তব্য জানতে বার বার তার সেল ফোনে কল দেওয়া হলেও তিনি কল রিসিভ করেন নি। বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মো: রকিবুল ইসলাম তালুকদার বলেন, আমি এ ধরনের কোন কর্মকান্ডের সাথে জড়িত নই।