
# ছিলেন ছাত্র লীগের ক্যাডার ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের নেতা।
# নিয়েছেন ভুয়া ঠিকানায় চাকুরী।
# ১৬ বছর ধরে লুটেছেন মাগুরা সদর হাসপাতালের ওষুধ পথ্য।
মাগুরা জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের অন্ত নেই। স্বাস্থ্য বিভাগে কর্মরত অধিকাংশ কর্মকর্তা ও কর্মচারিই বিগত আওয়ামী ফ্যাসিষ্ট সরকার আমলে ফুলে ফেঁপে বটগাছ হয়েছেন। অবৈধ পথে উপার্জিত অর্থে গড়েছেন বাড়ী, গাড়ি, ফ্ল্যাট। অনেকে আবার বেনামে নানা প্রকার ব্যবসায় অর্থ লগ্নি করেছেন। মাগুরা জেলার জনগনের জন্য বরাদ্দকৃত ওষুধ-পথ্য গায়েব করে দিয়ে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। তারা আওয়ামী লীগের সাবেক এমপিদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে তাদের সহায়তায় স্বাস্থ্য বিভাগে অবাধে লুটপাট চালিয়েছেন। অধিকার বঞ্চিত করেছেন মাগুরা জেলাবাসীকে। ৫ আগষ্ট ২০২৪ স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতন হলেও তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোন শাস্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং স্বাস্থ্য বিভাগের উর্ধতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে তারা ভাল ভাল পোষ্টিং বাগিয়ে নিয়েছেন।
মাগুরা স্বাস্থ্য বিভাগের এ রকমই একজন কর্মচারির নাম গৌতম কুমার সরকার। বিগত আওয়ামী লীগ আমলে যিনি মাগুরা ২৫০ শয্যা বেডের হাসপাতালের স্টোর কীপারের দায়িত্বে ছিলেন। দীর্ঘ ১৬ বছর এই দায়িত্বে থেকে তিনি ওষুধ পথ্য সরবরাহকারী ঠিকাদারদের সাথে আঁতাত করে কোটি কোটি টাকা অবৈধপথে আয় করেছেন। কখনো হাসপাতালের ওষুধ চুরি করে বাইরে বিক্রি করে দিয়েছেন। আবার কখনো ঠিকাদারের কাছ থেকে ওষুধ বুঝে না নিয়েই চালানে স্বাক্ষর করে দিয়েছেন। পরবর্তীতে ভুয়া রোগীর নামে ওষুধ বিতরণ দেখিয়েছেন। ওষুধ বিতরণ রেজিষ্টারে জাল তথ্য সংরক্ষণ করেছেন। উচ্চদামি ওষুধগুলো রাতের আধারে স্টোর থেকে বাইরে পাচার করে দিয়েছেন রোগীবাহী এ্যাম্বুলেন্সে করে। আর তার এ সব কাজে সহযোগিতা করেছেন হাসপাতালের উর্ধতন কর্মকর্তারা। এ ভাবে জনগনের হক মেরে স্টোর কীপার গৌতম কুমার সরকার যেমন কোটিপতি বনেগেছেন তেমন ওষূধ সরবরাহকারী ঠিকাদারও হয়েছেন হাজার কোটি টাকার মালিক।
অভিযোগ অনুসন্ধানে জানাগেছে, গৌতম কুমার সরকারের বাড়ী খুলনা জেলার ফুলতলা উপজেলায়। কিন্তু ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ আমলে তিনি ছাত্র লীগের কোটায় মাগুরা স্বাস্থ্য বিভাগের উন্নয়ন প্রকল্পে রেকর্ড কীপার পদে চাকুরী পেয়ে যান। ততকালীন আওয়ামী লিগের স্বাস্থ্য মন্ত্রী (যশোরের) তাকে চাকুরী দিয়েছিলেন। শোনা যায়, সে সময় তিনি ঠিকানা জাল করে চাকুরী লাভ করেন। তার পৈত্রিক নিবাস খুলনার ফুলতলায় হলেও তিনি মাগুরা জেলার ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে চাকুরী গ্রহন করেন। বিষয়টি আজঅব্দি গোপন রয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পে রেকর্ড কীপার পদে চাকুরী গ্রহন করলেও পরবর্তীতে তিনি আওযামী লীগের এক এমপির তদবীরে মাগুরা ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের স্টোর কীপারের দায়িত্বে পদায়ন পেয়েছেন। সেই থেকে শুরু হয় তার ভাগ্যের পরিবর্তন। হাসপাতালের ওষুধ সরবরাহকারী ঠিকাদারের সাথে আঁতাত না করে বরাদ্দকৃত ও ক্রয়কৃত ওষূধ নয়ছয় করে হাতিয়ে নেন কোটি কোটি টাকা। যশোর ও ফরিদপুরের ওষুধ পাচার সিন্ডিকেটের সাথে হাত মিলিয়ে নিজের ভাগ্য বদলে নেন গৌতম কুমার।
অনুসন্ধানকালে আরো জানা যায়, তিনি মাগুরা-২ আসনের সাবেক এমপি ও সাবেক যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী এড. বীরেন শিকদারকে নানা প্রকার উপঢৌকন দিয়ে হাতে রাখতেন। এবং এই এমপির বাসায় অধিক রাত পর্যন্ত অবস্থান করতেন। এমপি বীরেন শিকদার গৌতমের সকল অপকর্মের গডফাদারের ভুমিকা পালন করতেন।
আরো জানাগেছে, অবৈধ পথে উপার্জিত অর্থে গৌতম মাগুরা শহরের নতুন বাজার এলাকায় ৩ টি বহুতল বাড়ী নির্মাণ করেছেন। এই তিনটি বাড়ীর মুল্য কমপক্ষে ৩ কোটি টাকা। এ ছাড়া তার স্ত্রীর নামে একটি কোচিং সেন্টারসহ নানা প্রকার ব্যবসা রয়েছে। তিনি ভারতের বারাসাত জেলায়ও একটি বাড়ী ক্রয় করেছেন বলে শোনা যাচ্ছে। এ ছাড়া তার পুত্রকে ৪৫ লাখ টাকা খরচ করে শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজে ভর্তি করিয়েছেন।
ছাত্র জীবনে গৌতম আওয়ামী লীগের অংগ সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র লীগের ক্যাডার ছিলেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তাই চাকুরী জীবনেও তিনি আওয়ামী লীগের সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করেছেন। ৫ আগষ্ট শেখ হাসিনার পতন হলে মাগুরার ছাত্র জনতার দাবীতে তাকে খুলনায় বদলী করা হয়। সেখানে গিয়ে নানা পথে তদবীর করে ৫ লাখ টাকা ঘুসের বিনিময়ে গৌতম কুমার সরকার যশোর ২৫০ শয্যার সদর হাসপাতালের স্টোর কীপার পদে বদলী হয়ে আসেন। ছাত্র লীগের এই সাবেক ক্যাডার বর্তমানে ভোলপাল্টে যশোর সদর হাসপাতালে আরাম আয়েশে চাকুরী করছেন। যশোরের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতা হয়তো জানেই না যে, সাবেক ছাত্র লীগ ক্যাডার গৌতম কুমার বিগত ১৬ বছর যাবত মাগুরা জেলা বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
যশোর স্বাস্থ্য বিভাগের জাতীয়তাবাদী আদর্শের কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের দাবী, অতিসত্তর আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী, ছাত্র লীগের ক্যাডার ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের এই নেতার ভুয়া ঠিকানায় চাকুরী গ্রহন, জালিয়াতি করে ইনক্রিমেন্ট গ্রহন, বিগত ১৬ বছর যাবত মাগুরা জেলা ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের স্টোর কীপারের দায়িত্বে থেকে ওষুধ পথ্য নয়ছয় এবং আয়ের উৎসহীন অর্থে মাগুরা শহরে ৩টি বহুতল বাড়ী নির্মাণ, ভারতের বারাসাতে বাড়ী ক্রয়, স্ত্রীর নামে নানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিযোগগুলোর তদন্তের জন্য বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক। একই সাথে শেখ হাসিনার দোসর হিসাবে তাকে যশোর সদর হাসপাতালের স্টোর কীপারের দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা হোক। এ বিষয়ে তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, সচিব এবং মহাপরিচালক (স্বাস্থ্য অধিদপ্তর) এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানের দ্রুত পদক্ষেপ কামনা করেছেন।
অভিযোগ সমুহের বিষয়ে কথা বলার জন্য এই প্রতিবেদক একাধিকবার স্টোর কীপার গৌতম কুমারকে তার সেল ফোনে কল দিলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। (আলোকচিত্রে গৌতম কুমার সরকার ও তার ৩ টি বাড়ী দেখা যাচ্ছে।)