
উকিল মুন্সি ও বাউল রশিদ উদ্দিনের ‘শুয়াচান পাখি আমার/ শূয়াচান পাখি আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছ নাকি্।/গানটি পৌঁছে দিতে-দিতেই এই গান আর বারী সিদ্দিকী যেন একাকার হয়ে গেছেন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে… এবং এটি কখন ঘটে গেছে তা এদেশের গান প্রিয় মানুষজন বুঝতেই পারেনি। এই গানটি যখন যেখানে বেজে উঠেছে, সেখানেই যেন বারী সিদ্দিকী এসে হাজির হতো।
সেই জনপ্রিয় গ্রামীণ লোকসংগীত ও আধ্যাত্মিক ধারার গানের ও প্রাণের শিল্পী বারী সিদ্দিকীর আজ মৃত্যুবার্ষিকী।
বারী সিদ্দিকী আর তাঁর জনপ্রিয় ‘শুয়াচান পাখি আমার/ শূয়াচান পাখি আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছ নাকি।’ গানটির কথা, জন্মকথা ও ইতিহাস তুলে ধরলাম (তথ্য সংগ্রহ )।
গানটির কথা :
‘শুয়াচান পাখি আমার শূয়াচান পাখি
আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছ নাকি।।
তুমি আমি জনম ভরা
ছিলাম মাখামাখি,
আজ কেন হইলে নীরব
মেলো দুটি আঁখি।।
বুলবুলি আর তোতা ময়না
কত নামে ডাকি,
তোরে কত নামে ডাকি
শিকল ভেঙ্গে চলে গেলে কারে লইয়া থাকি।।
তোমার আমার এই পিরিতি
চর্ন্দ্র সূর্য সাক্ষী,
হঠাৎ করে চলে গেলে
বুঝলাম না চালাকিরে পাখি
আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছ নাকি।।’
গানটির জন্মকথা ও ইতিহাস :
(শূয়া চাঁন পাখি মানে, ‘শুয়ে আছে আমার চাঁন পাখি)
উকিল মুন্সি ছিলেন তখন বাউল রশিদউদ্দিনের সংগে পালা গানের বায়নায়। পায়ে হেটে তখন খালিয়াজুরি থেকে নেত্রকোনা মহকুমায় যেতে এক-দেড় দিনের রাস্তা। আসার সময় স্ত্রী বলেছিলেন, ‘আপনি তো যাইতাসুন বায়নায়, আমার’তো মনে হয় কালা জ্বর হইয়া গেছে (কালা জ্বরে তখন বাঁচতো না মানুষ।’
পালা গানের আসরে খবর আসলো, এরই মধ্যে স্ত্রী মারা গেলেন। কবর খোড়া হয়েছে, জানাজা হয়েছে, রশিদ উদ্দিন (উনি সিনিয়র ছিলেন) উনিও সাথে আ্সলেন। তখন কবরের পাশে উকিল মুন্সি স্ত্রীর মাথাটা কোলে নিয়ে উনি এই গানটা ওইখানেই রচনা করে গাইলেন:
শুয়াচান পাখি, আমার শূয়াচান পাখি আমি ডাকিতাছি তুমি, ঘুমাইছ নাকি।। তুমি আমি জনম ভরা, ছিলাম মাখামাখি, আজ কেন হইলে নীরব, মেলো দুটি আঁখি। বুলবুলি আর তোতা ময়না কত নামে ডাকি, তোরে কত নামে ডাকি শিকল কেটে চলে গেলে, কারে লইয়া থাকি।। তোমার আমার এই পিরিতি চর্ন্দ্র সূর্য্ সাক্ষী, হঠাৎ করে চলে গেলে বুঝলাম না চালাকিরে পাখি আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছ নাকি।
এই গানটি করে উকিল মুন্সি যখন কাঁদতেছেন তখন বাউল রশিদউদ্দিন উনাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য একটি অন্তরা গেয়েছিলেন :
বিশ্বজোড়া এই পিরিতি, সবই দেখছি ফাঁকি রে উকিল, সবই দেখছি ফাঁকি, বাউল রশিদ বলে চল রে উকিলললললল, ডাকলেই বা হইবো কি, তারে, ডাকলেই বা হইবো কি, পাখি, আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছ নাকি। শুয়াচান পাখি, আমার শূয়াচান পাখি, আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছ নাকি।
বারী সিদ্দিকীর জীবনী :
বারী সিদ্দিকী (১৫ নভেম্বর ১৯৫৪ – ২৪ নভেম্বর ২০১৭) বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান সংগীত শিল্পী, গীতিকার ও বংশী বাদক। তিনি মূলত: গ্রামীণ লোকসংগীত ও আধ্যাত্মিক ধারার গান করে থাকেন। তিনি তার গাওয়া ‘শুয়া চান পাখি, ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়’, ‘সাড়ে তিন হাত কবর’, ‘পুবালি বাতাসে’, ‘তুমি থাকো কারাগারে’, ‘রজনী’, ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়’, ‘ওগো ভাবিজান নাউ বাওয়া’, ‘মানুষ ধরো মানুষ ভজো প্রভৃতি গানের জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত।
বারী সিদ্দিকী ১৯৫৪ সালের ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশের নেত্রকোনা জেলায় এক সঙ্গীতজ্ঞ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে পরিবারের কাছে গান শেখায় হাতেখড়ি হয়। মাত্র ১২ বছর বয়সেই নেত্রকোনার শিল্পী ওস্তাদ গোপাল দত্তের অধীনে তার আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়। তিনি ওস্তাদ আমিনুর রহমান, দবির খান, পান্নালাল ঘোষ সহ অসংখ্য গুণীশিল্পীর সরাসরি সান্নিধ্য লাভ করেন। ওস্তাদ আমিনুর রহমান একটি কনসার্টের সময় বারি সিদ্দিকীকে অবলোকন করেন এবং তাকে প্রশিক্ষণের প্রস্তাব দেন। পরবর্তী ছয় বছর ধরে তিনি ওস্তাদ আমিনুর রহমানের অধীনে প্রশিক্ষণ নেন। সত্তরের দশকে জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাথে যুক্ত হন। ওস্তাদ গোপাল দত্তের পরামর্শে ক্লাসিক্যাল মিউজিক এর উপর পড়াশোনা শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে বাঁশির প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন ও বাঁশির ওপর উচ্চাঙ্গসঙ্গীতে প্রশিক্ষণ নেন। নব্বইয়ের দশকে ভারতের পুনে গিয়ে পণ্ডিত ভিজি কার্নাডের কাছে তালিম নেন। দেশে ফিরে এসে লোকগীতির সাথে ক্লাসিক মিউজিকের সম্মিলনে গান গাওয়া শুরু করেন।
তিনি গোপাল দত্ত এবং ওস্তাদ আমিনুর রহমান থেকে লোক এবং শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে পাঠ নিয়েছেন। মূলতঃ বংশী বাদক বারী সিদ্দিকী কথাসাহিত্যিক ও চিত্রনির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের প্রেরণায় নব্বইয়ের দশকে সঙ্গীত জগতে প্রবেশ করেন এবং অল্পদিনেই বিরহ-বিচ্ছেদের মর্মভেদী গনের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেন। এক সাক্ষাৎকারে সিদ্দিকী বলেন, “হুমায়ূন আহমেদ আমার গাওয়ার পেছনে যথেষ্ট উৎসাহ দিয়েছিলেন। মূলত তার সাহস নিয়েই সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়াস পেয়েছি।”
১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে বারী সিদ্দিকী প্রখ্যাত সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ‘রঙের বাড়ই’ নামের একটা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে জনসমক্ষে প্রথম সঙ্গীত পরিবেশন করেন। এরপর ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে হুমায়ূন আহমেদের রচনা ও পরিচালনায় নির্মিত শ্রাবণ মেঘের দিন চলচ্চিত্রে ৭টি গানে কণ্ঠ দেন। এর মধ্যে “শুয়া চান পাখি” গানটির জন্য তিনি অতিদ্রুত ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন।
১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে জেনেভায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাঁশি সম্মেলনে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে তিনি অংশগ্রহণ করেন।
২০১৩ সালে বারী সিদ্দিকী পাগলা ঘোড়া নাটকে প্রথমবারের মত অভিনয় করেন।
আজ ২৪ নভেম্বর, তার ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। রাজধানীর একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল করলে তাঁকে নেত্রকোনায় দাফন করা হয়।
মৃত্যুবার্ষিকীতে বারী সিদ্দিকীর রূহের মাগফিরাত কামনা করছি।