
আজ গোড়ানবাসীর অন্যরকম এক গর্বের দিন।
রাজধানী ঢাকার ভেতরে অন্যতম অবহেলিত একটি এলাকার নাম মনে হয় গোড়ান। গোড়ান— রাজধানীতে খিলগাঁও থানার মানচিত্রে নাম আছে, সুবিধার ক্ষেত্রে তালিকায় সংশ্লিষ্টদের বিমাতার সন্তান প্রায়। বিস্তৃত এই এলাকাটি জিপিও ‘জিরো পয়েন্ট’ থেকে মাত্র প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে, অথচ মনে হয় উন্নয়নের ট্রেন এখান দিয়ে শুধু হুইসেল বাজিয়ে চলে গেছে—থামে নাই। একেবারে প্রদীপের নিচে অন্ধকারের আদর্শ নমুনা। এই এলাকার অদূরে যে উড়াল সেতুটি আছে তা এখানকার কয়েক লাখ মানুষ সেটি শুধু দেখতে পারে, সেটি অনেকটা আকাশের চাঁদের মতো, নাগালের বাইরে।
এখানে বসবাসকারী আমরা সবাই ‘নাগরিক নামক প্রাণী’।
সরকারি গণপরিবহণ (বাস-মেট্টোরেল) আমাদের জন্য স্বপ্ন আর গল্পের মতো, যা গল্পে পড়েছি, ছবিতে দেখেছি, কিন্তু বাস্তবে পাইনি। চিকিৎসা সেবা? সে তো আরও উচ্চমার্গের কল্পবিজ্ঞান। অসুখ হলে আগে ভাবতে হয়—ডাক্তারের কাছে যাব, নাকি যানজটেই সুস্থ হয়ে যাব? যুগে-যুগে সংশ্লিষ্টদের বিমাতাসুলভ দয়া-দাক্ষিণ্যের উপর নির্ভর করেই আমাদের টিকে থাকা।
এলাকার প্রতিটি সড়ক সংস্কারের নামে প্রায় দেড় বছর ধরে ছিল পরীক্ষামূলক ধৈর্যচর্চা। রাস্তা কাটা, মাটি ফেলা, আবার কাটা—এই চক্রে আমরা সবাই অনানুষ্ঠানিকভাবে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হয়ে গেছি। মাসখানেক আগে রাস্তা প্রাণ ফিরে পেয়েছে বটে, কিন্তু ততদিনে আমাদের হাঁটার পেশি অলিম্পিক মানের হয়ে গেছে। ভাগ্যিস- বিদ্যুৎ, পানি, বর্জ্য ও পয়নিষ্কাষণের সেবা মোটামুটি ঠিকঠাক ছিল। না হলে ‘গ্যাস আসি-এই যাই’ নামের ডেইলি সিরিয়ালের সঙ্গে যোগ হতো আরও একখানা ট্র্যাজেডি। তখন গোড়ানবাসী হিসেবে আমরা হয়তো রান্না করতাম স্মৃতি দিয়ে, আর গোসল করতাম স্বপ্নে, বাস করতাম ভাগাড়ে।
এলাকার কোনো কোনো অংশে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক এমন আচরণ করে, যেন সে নিজেও এখানে থাকতে চায় না। এক মিনিট আছে, পরের মিনিটে নিরুদ্দেশ। তখন মনে হয়, আমি কি গোড়ানে আছি, নাকি কোনো দুর্গম জঙ্গলে? মশক নিধনের ফগার মেশিনের শব্দ বহুদিন কানে আসেনি—ভাবে মনে হয় সম্ভবত মেশিনটি অবসর নিয়েছে। কিন্তু মশাদের সংগীতচর্চা নিয়মিত। দিনেও অল্প-বিস্তর, তবে সন্ধ্যা নামলেই তারা দল বেঁধে কনসার্ট শুরু করে দেয়—ভিআইপি পাস ছাড়া কারও রেহাই নেই।
আজ গোড়ানবাসীর অন্যরকম এক গর্বের দিন। বায়ু দূষণের তালিকায় নিজের বসতি এলাকার নাম জ্বলজ্বল করছে! ১৩ জানুয়ারি, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে বিশ্বের ১২৪টি নগরীর মধ্যে তৃতীয় স্থানে ঢাকা। আমাদের স্কোর ২৩৮—মানে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’। প্রথম নয়াদিল্লি (৪২০), দ্বিতীয় হ্যানয় (২৫৫)। প্রতিযোগিতা বেশ জমজমাট। ঢাকার আটটি স্থানের বায়ুর মান তখন খুব খারাপ—ধানমন্ডি ২৮২, মিরপুর ইস্টার্ন হাউজিং ২৭১, দক্ষিণ পল্লবী ২৬৬, বেচারাম দেউড়ী ২৬২, বে’জ এজওয়াটার ২৫৩, গ্রেস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ২৩২, আমাদের গোড়ান ২২৪, আর শান্তা ফোরাম ২১৫।
গোড়ানের নামটা তালিকায় দেখে বুকটা কেমন করে উঠল। ভাবলাম, অবশেষে আমরা কোথাও তো আছি! উন্নয়নের গল্পে না থাকি, অন্তত দূষণের খাতায় আমাদের উপস্থিতি জোরালো। হয়তো একদিন বলা হবে—এই এলাকাটি বায়ুদূষণে নিয়মিত অবদান রাখায় বিশেষভাবে স্বীকৃত।
এই লেখা মনের কষ্ট থেকেই। কিন্তু কষ্টের মধ্যেও যদি একটু হাসি না ঢুকাই, তাহলে গোড়ানে বাঁচা দায়। তাই আমরা দূষণ গিলি, মশার গান শুনি, নেটওয়ার্ক খুঁজি, আর প্রতিদিন নতুন করে আবিষ্কার করি—রাজধানীর ভেতরেও কীভাবে একজন মানুষ একটু বাইরে থাকতে পারে।#
[কৈফিয়ত: আমার এই লেখাটি অন্য কারো মনে কষ্ট দেয়ার জন্যে না। তবে নিজের কষ্টের কথা প্রকাশ করলে নাকি বুকটা হালকা হয় কিছুটা, তাই প্রকাশ করলাম। তবুও যদি কারো মনে কষ্ট লেগে থাকে, তবে আমি দুঃখিত।- তানভীর আলাদিন]
লেখক : তানভীর আলাদিন