
// তানভীর আলাদিন //
পদ্মা নদীর তাজা ইলিশ ভাজির মতোই কোনো কোনো গল্পের স্বাদ থাকে একেবারে সমসাময়িক, উষ্ণ ও ঝাঁঝালো। পাঠকের মনে হয়—এ তো এ সময়েরই চলমান কাহিনি! ‘ফেরার পথে’ ঠিক তেমনই এক উপন্যাস, যা পড়তে গিয়ে মনে হয় পাঠক নিজেই যেন গল্পের ভেতর হাঁটছেন, চরিত্রদের সঙ্গে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন, কাঁদছেন, ভাঙছেন আবার গড়ছেন।
উপন্যাসের কেন্দ্রে এক বিদেশফেরত উচ্চশিক্ষিত যুবক। মমতাময়ী মায়ের কোলেই যার সুখের ঠিকানা। কিন্তু একটি সংলাপ—চাঁদাবাজদের ‘না’ বলা—তার জীবনকে হঠাৎই ঘূর্ণিপাকে ফেলে দেয়। মবের রোষানলে পড়ে সে হয়ে ওঠে মামলার আসামি, হাজতি, রিমান্ড-দেখা এক ভাঙাচোরা মানুষ। দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত বিয়েও ভেঙে যায়; হবু বধূ অন্যের হয়ে যায়।
এই বিপর্যয়ের মধ্যেও লেখক আশা নিভতে দেন না। ভালোবাসার এক আলোকরেখা থেকে যায়, যে মরাগাছে ফুল ফোটানোর স্বপ্ন দেখে। কিন্তু সামাজিক বাস্তবতা এখানে নির্মম। ইবলিশ যেন গার্লফ্রেন্ডের রূপ ধরে যুবকটিকে টেনে নেয় মেকি স্বর্গের দিকে—ক্যাসিনো, বার, বিলাসের নেশা। শেষ পর্যন্ত পৈত্রিক ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য হারিয়ে সে পরিণত হয় এক করুণ ক্লাউনে।
সব হারিয়ে যখন বোধোদয় ঘটে, তখন তার একমাত্র আকাঙ্ক্ষা—ঘরে ফেরা। কিন্তু ঘর কি তাকে গ্রহণ করবে? যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে সে একে একে সব আপনজন থেকে দূরে সরে গেলেও অন্তর্গত টান তাকে আবার ফিরিয়ে আনে। পরিবর্তনের আন্তরিক প্রয়াস দেখে মা-বাবা ও স্বজনেরা বুক পেতে ডাক দেন। বাবা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ছোট পরিসরে একটি পার্টির আয়োজন করেন বেইলি রোডে—নতুন জীবনের সূচনার প্রত্যাশায়।
যুবকটি জানায়, সে ‘ফেরার পথে’। কিন্তু নিয়তি নির্মম। হোটেলের কাছাকাছি পৌঁছে সে দেখে দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন—স্বপ্ন, প্রত্যাবর্তন, পুনর্জন্ম—সব যেন আবারও অনিশ্চয়তার মুখে।
হাবিবুর রহমান বাবুর উপন্যাস ‘ফেরার পথে’ বিষয় নির্বাচনে সাহসী ও প্রাসঙ্গিক। চাঁদাবাজি, মব-মানসিকতা, সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিক পতন এবং পরিবার নামক আশ্রয়ের ভঙ্গুরতা—সব মিলিয়ে এটি এক সমসাময়িক সমাজচিত্র। লেখকের ভাষা সহজ, সংলাপপ্রধান এবং গতিময়; পাঠককে টেনে নিয়ে যায় শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত।
বিশেষ করে ‘ঘরে ফেরা’ মোটিফটি এখানে কেবল শারীরিক প্রত্যাবর্তন নয়, বরং আত্মিক পুনর্জাগরণের প্রতীক। নায়ক ভাঙে, পথভ্রষ্ট হয়, লাঞ্ছিত হয়; তবু তার ভেতরে এক বিন্দু আলোর অনুসন্ধান জাগ্রত থাকে।
উপন্যাসটি প্রকাশ করেছে সাহিত্যদেশ। তুনিশা সুমাইয়া তুলতুলের আঁকা প্রচ্ছদ নজরকাড়া। বইটির মূল্য ৩০০ টাকা। পাওয়া যাচ্ছে অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ৫৯৭ ও ৫৯৮ নম্বর স্টলে।
প্রথম উপন্যাস হিসেবেই ‘ফেরার পথে’ লেখকের সম্ভাবনার জোরালো জানান দেয়। সমসাময়িক বাস্তবতার নিরিখে এটি কেবল একটি গল্প নয়, বরং সময়ের আয়নায় নিজেকে দেখার আমন্ত্রণ। যে পাঠক সমাজবাস্তবতার ভেতর মানবিক পুনর্জাগরণের গল্প খোঁজেন, তাঁদের জন্য বইটি প্রাসঙ্গিক ও পাঠযোগ্য।#