
মহামারির করোনা সময় যখন মানুষ ঘর থেকে বের হতো না সেই কঠিন সময়ে নিজের জীবন বাজি রেখে হাসপাতালে মানুষের পাশে দাড়িয়েছিলেন কোভিড-১৯ প্রকল্পের (ইআরপিপি) অধীনে নিয়োগ পাওয়া স্বাস্থ্যকর্মীরা। মেয়াদ শেষ হওয়ায় প্রকল্পের কর্মীরা এখন বেতনহীন। চাকরির কোনো নিশ্চয়তাও নেই। তাই সংসারের চাকা সচল রাখা তাদের জন্য প্রতিদিন এক যুদ্ধ। এমতবস্থায় বকেয়া পরিশোধ ও চাকরি স্থায়ী করার দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন তারা।
রোববার (২৭ এপ্রিল) ঢাকার মহাখালীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রবেশমুখ আটকে বিক্ষোভ শুরু করেন তিন শতাধিক স্বাস্থ্যকর্মী। পরে আন্দোলনকারীরা বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কক্ষের সামনে অবস্থান নেন।
এসময় রাজশাহী মেডিকেল কলেজের আরটিপিসিআর ল্যাবের কনসালটেন্ট আব্দুর রহমান বলেন, মহামারির সময় একদিনও দায়িত্ব থেকে পিছপা হইনি। এখন কি সেই শ্রমের কোনো মূল্য নেই? দেশের সংকটকালে আমরা জীবন বাজি রেখে কাজ করেছি। আজ আমাদের জীবন এত অমূল্য হয়ে গেল?
তিনি বলেন, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে আমাদের চাকরি স্থায়ীকরণ অত্যন্ত জরুরি। নতুন করে প্রশিক্ষণ দিয়ে নতুন জনবল গড়ার চেয়ে আমাদের ধরে রাখাই হবে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।
দাবি পূরণের লিখিত প্রতিশ্রুতি না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি।
কর্মসূচিতে আসা সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট আসিফ সজিব বলেন, আমাদের প্রকল্প ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে শেষ হয়েছে কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আশ্বাসে আমরা ২৫ জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ডিউটি করে আসছি। বলেছিল আমাদের চুক্তি ৬ মাস বৃদ্ধি করবে এবং ওপি করবে। ৬ মাস বৃদ্ধির বিষয়টি পিএসসি এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের জন্য আটকে আছে। জানি না আমাদের ভবিষ্যৎ কি।
তিনি বলেন, সেই জানুয়ারি মাস থেকে এখন পর্যন্ত আমরা বেতন পাইনি। এই বয়সে এসে এভাবে চলা যায়? আমাদের অবস্থা এখন এমন হয়েছে যে বাবার জন্য ওষুধ কিনতে পারি না। ছেলেমেয়ের মুখে ঠিকমতো খাবার তুলে দিতে পারি না। মাঝেমধ্যে মনে হয় আমি ব্যর্থ।
ডেটা অপারেটর হিসেবে কাজ করা এক তরুণী বলেন, শুধু ভাতের খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছি। অথচ মানুষকে জীবন বাঁচানোর তথ্য সরবরাহ করেছিলাম আমি। নিজের খাবার খরচ চালাতে পারছি না, রুম ভাড়া বাকি। আমাদের কেউ কেউ এমন আছেন যারা তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছেন। কারো সংসারে ধার-দেনার পাহাড়।
তিনি আরও বলেন, আমরা মানুষ বাঁচাতে কাজ করেছি। এখন নিজের সন্তানকে ঠিকমতো খাবার দিতে পারি না।
শুধু তিনি নন, উপস্থিত অনেক কর্মীর মুখেই শোনা গেল– সংসার টিকছে না, ব্যাংক লোন বকেয়া, বাসা ভাড়া দিতে না পারায় মালিক বাসা ছাড়তে বলছে এমন কথা।
এবিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, ইআরপিপি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো ও অর্গানোগ্রামের বিষয়টি মন্ত্রণালয় পর্যায়ে প্রক্রিয়াধীন। তবে আন্দোলনরত কর্মীরা বলছেন, ‘শুধু আশ্বাসে আমাদের পেট চলবে না। লিখিত সিদ্ধান্ত চাই, দ্রুত বকেয়া বেতন চাই।’
স্বাস্থ্যকর্মীরা মনে করছেন, কোভিডের সময় দেশে যখন মৃত্যু আর আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছিল, তখন তাদের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। এখন সেই ত্যাগের স্বীকৃতির বদলে তারা অবহেলার শিকার হচ্ছেন।
প্রসঙ্গত, কোভিড-১৯ মহামারির সময় স্বাস্থ্যসেবা, বিশেষ করে কোভিড পরীক্ষার জন্য সরকার ৩৯৩ জন স্বাস্থ্যকর্মীকে নিয়োগ দিয়েছিল সরকার। কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যান্ডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস (ইআরপিপি) প্রকল্পের অধীনে নিয়োগ পেয়েছিলেন তারা।
পরবর্তীতে, তাদের ইআরপিপি প্রকল্পের অধীনে স্থানান্তরিত করা হয় এবং মেডিকেল অফিসার, নার্স এবং টেকনোলজিস্ট সহ আরও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা হয়। এতে মোট কর্মীর সংখ্যা ১,১৫৪ জনে উন্নীত হয়। বর্তমানে, প্রকল্পের অধীনে ১,০০৪ জন কাজ করছেন।